রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ‘মাদ্রাসা’ নেই—তবু আছে নিয়োগপত্র, আছে বেতন, এমনকি চলছে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়াও। বাস্তবে কোনো শিক্ষা কার্যক্রম না থাকলেও এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়োগ দিয়ে আদায় করা হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ—এটি একটি সুপরিকল্পিত নিয়োগ বাণিজ্য।
সরেজমিনে ১৫ জুলাই মঙ্গলবার পাংশার মাছপাড়া হলুদবাড়িয়া গ্রামে গেলে দেখা যায়, ওই এলাকায় মাঠঘেঁষা রাস্তায় সারি সারি কলাগাছ আর আখের খেত। কোথাও কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। অথচ সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী এখানেই রয়েছে “মাছপাড়া হলুদবাড়িয়া আল রাফিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা” নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২২ বছর আগে শুধুমাত্র নামকরণ করে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন করা হয়। এরপর থেকে আর কোনো ভবন, শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষার্থীর দেখা মেলেনি। তথাকথিত প্রধান শিক্ষক রজব মোল্লা দাবি করেন, তিনি ১৯৯৩ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন এবং কিছু বেতনও পাচ্ছেন। তার ভাষ্যমতে, মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। মাদ্রাসার নামে নির্ধারিত জায়গায় কোনো স্থাপনা, ন্যূনতম পাঠদান পরিবেশ বা শিক্ষার্থী নেই। বরং স্থানীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় চলছে নিয়োগ বাণিজ্য।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই অবাস্তব মাদ্রাসার নামে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একাধিকজনকে। প্রতি চাকরিপ্রার্থীকে দিতে হয়েছে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা করে। স্থানীয় এক সাংবাদিক ‘চাকরি নিতে’ আগ্রহ দেখালে, পাংশা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কালাম ডাঃ ফোনে জানান, “চাকরি পেতে হলে তিন লাখ টাকা লাগবে।”
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও লক্ষণদিয়া ওয়ার্ড সভাপতি আকুব আলী মণ্ডল বলেন, “এখানে কোনো স্কুল-মাদ্রাসা নেই। আখের ক্ষেত পাহারা দিয়ে প্রধান শিক্ষক বেতন নিচ্ছেন— এটা কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা!”
অভিযোগ উঠেছে, পাংশা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাঁর আশ্রয়ে প্রতিষ্ঠানটির নামে বিভিন্ন নিয়োগ সম্পন্ন হয় বলে দাবি স্থানীয়দের। তবে শাহাবুদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নই। শুধু জানি, প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তির চেষ্টা করছে।”
স্থানীয় আব্দুল খালেক বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির নামে মাত্র ৮ শতক জমি আছে, কিন্তু তাতেও কোনো স্থাপনা নেই। তারপরও এমপিওভুক্তির জন্য উঠেপড়ে লেগেছে কিছু লোক।”
এই দুর্নীতির বিষয়ে জানতে পাংশা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে শিক্ষা অফিসের অবস্থানও স্পষ্ট নয়।
শিক্ষার নামে এমন প্রতারণা ও দুর্নীতিতে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাঁরা বলছেন, “শিক্ষা খাতকে ঢাল বানিয়ে যারা টাকা লুটছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।”
তদন্তের দাবি জানিয়ে এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।