বিশ্বের সুন্দরতম ১০ রমজান-ঐতিহ্য
বিশ্বজুড়ে দুই বিলিয়নেরও বেশি মুসলমান যখন পবিত্র রমজান মাস উদ্যাপনে একত্র হয়, তখন একই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কৃতি, প্রথা ও আনন্দঘন মুহূর্তগুলোর বৈচিত্র্যও দর্শনীয় হয়ে ওঠে। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিশ্বের ১০টি সুন্দরতম রমজানে ঐতিহ্যের কথা।
১. মিসরের রঙিন ফানুস
রমজান মাসে মিসরের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্য হলো সন্ধ্যায় ও রাতের বেলা রঙিন ঝলমলে ফানুস জ্বালানো।
এই ঐতিহ্যটি সম্ভবত ফাতিমীয় খিলাফতের সময় শুরু হয়। খলিফা আল-মুইজ লিদিনিল্লাহ কায়রো আগমনের সময় রঙিন ফানুস দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। সেই থেকে রমজান মাসে মিশরের রাস্তাঘাট ফানুসের আলোয় আলোকিত হয় এবং রোজাদারদের মুহূর্তগুলো আনন্দঘন করে তোলে।
২. ভারতের ‘সাহরিওয়ালা’
মুঘল আমলে সাহরিওয়ালারা শেষ রাতে সাহরির জন্য সবাইকে জাগিয়ে তুলতেন। আজও ভারতের দিল্লির সাহরিওয়ালা সেই পুরোনো মুঘল ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। দিল্লিতে তারা ‘জোহরিদার’ নামেও পরিচিত, মানে নগর প্রহরী। এই প্রহরীরা রাতে পবিত্র কোরআনের আয়াত, আল্লাহ ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম উচ্চারণ করে ধ্বনি দেন, যাতে সবাই সাহরির জন্য জেগে উঠতে পারেন এবং ফজরের নামাজের প্রস্তুতি নিতে পারেন।
৩. ইন্দোনেশিয়ার ‘পাদুসান’
জাভা দ্বীপের অনেক মুসলমান রমজানের সূচনার আগে ‘পাদুসান’ নামে পরিচিত এক বিশেষ গোসলের ঐতিহ্য অনুসরণ করেন। জাভানিজ ভাষায় ‘পাদুসান’ শব্দের অর্থ ‘গোসল করা’। মুসলমানরা এই সময়ে প্রাকৃতিক ঝরনা বা হ্রদে স্নান করে নিজেদের শারীরিক ও আত্মিকভাবে পবিত্র করেন। অনেকে অবশ্য আজকাল বাড়িতেই গোসল সেরে নেন। রমজান পূর্ব গোসলকে তাদের মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতির প্রতীক ধরা হয়ে থাকে।
৪. মরক্কোর ‘নাফার’
মরক্কোতে রমজান মাসে ‘নাফার’ নামে পরিচিত নগর প্রহরীরা ভোরে পাড়ায় ঘুরে ঘুরে লোকজনকে নামাজের জন্য জাগিয়ে তোলেন। এর জন্য সাধারণত একটি ঐতিহ্যবাহী শিঙা বাজানো হয়। অনেকে আবার ‘লোদরা’ নামে পরিচিত ভেড়া বা ছাগলের চামড়া দিয়ে তৈরি ড্রাম বাজিয়ে পরিবার ও প্রিয়জনদের ইফতারের আমন্ত্রণ জানান এবং ধর্মীয় সংগীত পরিবেশন করেন।
৫. পাকিস্তানের ‘ঢোলওয়ালা’
পাকিস্তানে রমজানের সময় সাহরির জন্য মানুষকে জাগিয়ে তোলার একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্য হলো ‘ঢোলওয়ালারা’ বা ঢোল বাজিয়ে আহ্বান করা।
ঢোলওয়ালারা সাধারণত গভীর রাতে রাস্তায় বের হন এবং বড় ঢোল বাজিয়ে মানুষের ঘুম ভাঙান, যাতে তারা সাহরির জন্য প্রস্তুত হতে পারেন। এটি মূলত পাঞ্জাব, সিন্ধু ও খাইবার পাখতুনখাওয়া অঞ্চলে বেশি প্রচলিত, যেখানে এই ঐতিহ্য শতাব্দীপ্রাচীন।
অনেক সময় তারা বিভিন্ন ধর্মীয় গান বা কোরআনের আয়াতও উচ্চারণ করেন, যা রমজানের আধ্যাত্মিক আবহকে আরও গভীর করে তোলে। আধুনিক যুগে অ্যালার্ম ঘড়ি ও মোবাইল ফোন সহজলভ্য হওয়া সত্ত্বেও এই ঐতিহ্য এখনো পাকিস্তানের অনেক এলাকায় টিকে আছে।
৬. ইরাকের ‘মুহাইবিস’
ইফতারের পর ইরাকের অনেক পুরুষ জমায়েত হয়ে ঐতিহ্যবাহী খেলা ‘মুহাইবিস’ খেলেন। খেলাটির ধরন এমন যে, একজন একটি আংটি কাপড়ের নিচে লুকিয়ে রাখবেন এবং অন্যরা তার শরীরী ভাষা পর্যবেক্ষণ করে আন্দাজ করবেন তিনি আংটিটি কোথায় লুকিয়েছেন।
যুদ্ধের কারণে অনেক বছর এই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হওয়ার শঙ্কা ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবার তা পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে এবং ইরাকিরা রমজানে তাদের প্রিয় খেলাটি ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন।
৭. ক্যামেরুনের ‘দরজা খোলা রাখা’
রমজানের অন্যতম সুন্দর ঐতিহ্য হলো ক্যামেরুনের মুসলমানদের উদারতা। ইফতারের ঠিক আগে অনেক পরিবার তাদের দরজা খুলে রাখে, যেন কেউ বাইরে থেকে এসে ইফতার করতে পারেন। অতিথিদের আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা ক্যামেরুনের রমজান সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা এই মাসটিকে আরও সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলে।
৮. তুরস্কের ‘ড্রামার’
এই ঐতিহ্যটি ওসমানী সাম্রাজ্যের আমল থেকে চলে আসছে। তুরস্কের বিভিন্ন অঞ্চলে রমজানের সময় বিশেষভাবে নিযুক্ত ড্রামাররা রাতের শেষ প্রহরে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন। ড্রামাররা তখন ঐতিহ্যবাহী ওসমানীয় পোশাক পরিধান করেন এবং ‘দাউল’ নামের বৃহৎ আকারের তুর্কি ড্রাম বাজিয়ে মানুষকে সাহরির জন্য জাগিয়ে তোলেন।
৯. মালদ্বীপের ‘রাইভারু পাঠ’
রমজান মাসে মালদ্বীপ এক বিশেষ আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যে পরিণত হয়, যার অন্যতম প্রধান দিক হলো ‘রাইভারু’ নামের ধর্মীয় কবিতা পাঠ। এটি মালদ্বীপের এক প্রাচীন কবিতা রচনার ধারা, যা বিশেষ ছন্দ ও শৈলীতে আবৃত্তি করা হয়। মালদ্বীপের অনেক মুসলমান রমজান মাসকে আরও অর্থবহ করে তুলতে এই ধর্মীয় কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে রোজার সংস্কৃতিতে অংশ নেন।
১০. দক্ষিণ আফ্রিকার ‘চন্দ্র দর্শক’
দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘মুন ওয়াচার’ বা আফ্রিকান ‘মান কাইকার্স’ নামে পরিচিত ব্যক্তিরা চাঁদ দেখার ঐতিহ্য পালন করেন। তারা সিগন্যাল হিল, সি পয়েন্ট প্রমেনাড বা থ্রি অ্যাঙ্কর বে-তে দাঁড়িয়ে ঈদের চাঁদ দেখার পর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন। প্রাচীন এই ঐতিহ্য দক্ষিণ আফ্রিকার মুসলিম বিচার পরিষদের অধীনে পরিচালিত হয় এবং রমজানের সমাপ্তি ও ঈদের সূচনা চাঁদ দেখার মাধ্যমে উদ্যাপন করা হয়।
এভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রমজানের অনন্য রীতি-নীতি আমাদের ইসলামের বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই মাসটি কেবল আত্মশুদ্ধি ও উপাসনার সময় নয়, বরং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে সম্প্রদায়গুলোর সংযোগ গড়ে তোলার এক অনন্য উপলক্ষও বটে।
সূত্র: উইসকনসিন মুসলিম জার্নাল
মতামত দিন